চিহ্ন

July 19, 2020

উনিশ বছর পর নীলাকে দেখে চিনতে একটুও দেরী হলো না সুব্রতর।

এগিয়ে গিয়ে ডাকল, ‘নীলা!’

সুব্রতের ডাকে কিছুটা যতটা না চমকে উঠলো , তার চেয়ে বেশী বিব্রত হলো নীলা। তিনটা বছর, এক হাজার পচানব্বই টা দিন এই মানুষটার সুখ দুঃখের সংগী ছিল সে, তারপর কোন ভাবে উনিশ বছরের গ্যাপ পড়ে গেছে নীলার - যার দিনের হিসাব টা আর রাখা হয়নি!

সুব্রত আবার বলল, “চিনতে পারছো?”

“একটু ফিট ফাট হয়েছো এই যা, চিনতে না পারার তো কোন কারন নেই!” নীলার কন্ঠস্বর ঠান্ডা ধরনের- কথাটা প্রসংসা ছিল নাকি সুক্ষ্ম খোচা ছিল সুব্রত সেটা ধরতে পারলো না।

“তুমি কমলাপুরে? ”

“চিটাগাং যাব…”

“একা??” সুব্রতের কেন যেন অদ্ভুত নস্টালজিয়া অনুভূত হয়। কিন্তু বাইরে সেটা প্রকাশ করা যাবেনা!

নীলা খানিক দূরে বসে থাকা তার মেয়েকে দেখিয়ে বলে, “নাহ , রাইসা আছে সাথে… ”

সুব্রত নীলার মেয়ের দিকে তাকালো, নীলার মতই দেখতে অনেকটা।১৭-১৮ বয়েস। চোখ গুলো অদ্ভুত সুন্দর হয়েছে মেয়েটার, বসে বসে পেপার পড়ছে। সুব্রত বলল, “পরিচয় করিয়ে দাও তোমার মেয়ের সাথে!” নীলার মুখের রেখাগুলো কঠিন থেকে কঠিনতর হতে থাকে, শক্ত গলায় দৃঢ়ভাবে বলল, “না!” দৃঢ়তাটুকু প্রচন্ড কানে ঠেকলো সুব্রতর। কিন্তু কিছু বলল না সে… ১৯ বছর আগে এই মেয়েকে ফিরিয়ে দিয়েছিলো সে, এই মেয়ের কাছে অনেক অপরাধ জমা তার , এত সহজে সহজ হওয়া যাবেনা!

সুব্রত বলল, “ওর বাবা আসেনি?”

নীলা একপলকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষন , বলল “না, ও এয়ারপোর্ট থেকে উঠবে- কাজ পড়ে গেছে একটা! তুমি এখানে কেন?”

“চিটাগাং ই যাব, ড্রাইভার অসুস্থ- গাড়ি নিয়ে এতদুর যাওয়ার সাহস হলোনা তাই ট্রেনে…”

কথায় কথায় গাড়ি যে আছে সেটা জানিয়ে দেয়া গেল, অদ্ভুত তৃপ্তি পেল সুব্রত। নীলা কিছু বলল না। দুজনই চুপ থাকলো কিছুক্ষন ,ধুলো জমা কিছুসময় দুজনের চোখে জমে থাকলো কিছুক্ষন ! ট্রেনের হুইসেলে হুশ হলো দুজনেরই… সুব্রত জিজ্ঞেস করলো, “কোন বগী তোমাদের?”

“ট”

“ওহ… আমার ‘ক’ ”

“যাই তাহলে…”

একটু আমতা আমতা করে সুব্রত বলল, “আচ্ছা তোমার নাম্বার টা দাও তো!”

“কেন?”

সুব্রত হাসার চেষ্টা করে, “ভুলেই তো গেছো আমাকে, আবার ভুলে যাবা… সো মাঝে মাঝে তোমাকে মনে করিয়ে দেয়ার দায়িত্ব নিতে চাই!”

নীলা হাটতে থাকে তার মেয়ের দিকে, শেষে একবার ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, “তোমাকে ভুলব? উনিশ বছর ধরে তোমার চিহ্ন সাথে নিয়ে ঘুরছি - ভুলবো কি করে?”

সুব্রত চোখ মুখ শক্ত করে হিসাব মেলানোর চেষ্টা করতে থাকে, হঠাত করেই সব যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে- উহু উহু একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবতে হবে… কি বলছে নীলা… ১৯ বছরের কৌতুহলের উত্তরটা কি এত নির্মম হতে পারে!

নীলা চলে গেল, সাথে ট্রেনও… এই জীবনে সুব্রত কখনোই নীলা কিংবা ট্রেন কাউকেই ধরতে পারেনি।